
নিজস্ব প্রতিবেদক, মাধবপুর (হবিগঞ্জ)
ঈদ মানেই পরিবারে খুশির ছোঁয়া, প্রিয়জনদের সঙ্গে একত্র হওয়ার উচ্ছ্বাস। এমনই এক আনন্দে ভরপুর উদ্দেশ্যে চট্টগ্রাম শহরের পথে রওনা হয়েছিল একটি পরিবার। কিন্তু ঈদের আগেই চিরতরে নিভে গেল তাদের চোখের মণি, সাত বছরের ছোট্ট শিশু রাফির প্রাণ—ট্রেনের ধাক্কায় ঝরে গেল এক নিষ্পাপ প্রাণ। শোকস্তব্ধ পরিবার, হতবাক স্থানীয় বাসিন্দারা।
বুধবার (৫ জুন) সকাল সাড়ে ৮টার দিকে হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার বিশ্বরোড সংলগ্ন একটি অরক্ষিত রেলক্রসিংয়ে ঘটে এই হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনা। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, পরিবারটি একটি অটোরিকশায় করে চট্টগ্রামগামী বাস ধরার উদ্দেশ্যে রাস্তা পার হচ্ছিল। ঠিক তখনই ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা একটি আন্তঃনগর ট্রেন দ্রুতগতিতে ছুটে আসে। ট্রেনের হুইসেল শোনা গেলেও, গেইটম্যান না থাকায় এবং সতর্কতা সংকেত কার্যকর না থাকায় পরিবারটি ট্রেন আসার বিষয়টি বুঝতে পারেনি।
রাফি তার বাবা-মা ও ছোট বোনের সঙ্গে রিকশা থেকে নামার মুহূর্তে ট্রেনের ধাক্কায় ছিটকে পড়ে যায়। ট্রেন চলে যাওয়ার পর আশপাশের মানুষ ছুটে এসে শিশুটিকে গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করে মাধবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। তবে চিকিৎসকরা জানান, পথেই তার মৃত্যু হয়েছে।
নিহত রাফি স্থানীয় একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। ঈদের নতুন জামা পরে দাদু-দাদির সঙ্গে দেখা করতে চট্টগ্রাম যাচ্ছিল সে। ছোট্ট ছেলের নিথর দেহ বুকে জড়িয়ে কাঁদছিলেন মা — এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য তৈরি হয় হাসপাতাল চত্বরে।
মাধবপুর রেলস্টেশন ও থানা সূত্রে জানা গেছে, দুর্ঘটনাস্থলে রেলক্রসিং থাকলেও সেখানে গেইটম্যান বা স্বয়ংক্রিয় গেট নেই। স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেছেন, বহুদিন ধরে এই রেলক্রসিংয়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা অনুপস্থিত। আগেও একাধিক দুর্ঘটনা ঘটেছে এখানে। তবুও কর্তৃপক্ষের উদাসীনতায় আবারও প্রাণ হারাল এক শিশু।
মাধবপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. গোলাম দস্তগীর বলেন, “আমরা ঘটনাটি শুনেই ফোর্স পাঠিয়েছি। শিশুটির মৃত্যু অত্যন্ত দুঃখজনক। রেলওয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে আমরা বিষয়টি তদন্ত করছি।”
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা বলেন, ঈদের আগে এমন দুর্ঘটনা শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো সমাজের হৃদয়ে আঘাত হানে। দ্রুত অরক্ষিত রেলক্রসিংগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত না করলে এমন মৃত্যু থামবে না।
রাফির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই এলাকাজুড়ে নেমে আসে শোকের ছায়া। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাফির বন্ধুরা ও শিক্ষকরা চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি।
ছোট্ট রাফির জন্য ঈদের নতুন পোশাক কেনা হয়েছিল, মিষ্টান্নের ব্যবস্থা করা হয়েছিল — কিন্তু সে আর কখনও হাসিমুখে “ঈদ মোবারক” বলবে না। একটি প্রাণের বিনিময়ে আরও একবার প্রমাণিত হলো, অবহেলা আর অনিরাপত্তাই আমাদের রেলপথের নিত্যসঙ্গী।
প্রতিবেদন,,, মোঃ মাছুম আহমেদ