
প্রতিবেদক: নিজস্ব প্রতিবেদক
বিএনপি চেয়ারপার্সন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া আর নেই। মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) ভোর ৬টায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তার মৃত্যুর মাধ্যমে দেশের রাজনীতিতে এক দীর্ঘ অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটলো।
১৯৮১ সালে স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর আকস্মিকভাবেই রাজনীতির মূলধারায় প্রবেশ করেন বেগম খালেদা জিয়া। যিনি ছিলেন একজন সাধারণ গৃহবধূ, রাজনীতিতে আসার কোনো পূর্বপ্রস্তুতি বা আকাঙ্ক্ষা যার ছিল না—সেই নারীই পরবর্তীতে হয়ে ওঠেন বাংলাদেশের অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব।
বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর চেয়ারপার্সন এবং ১৯৯১ সাল থেকে তিনবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নির্বাচিত নারী সরকারপ্রধান।
১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট দিনাজপুর জেলায় ইস্কান্দার মজুমদার ও তৈয়বা মজুমদারের ঘরে জন্মগ্রহণ করেন খালেদা জিয়া। তার পারিবারিক আদি নিবাস দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় জেলা ফেনীতে। দিনাজপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও সুরেন্দ্রনাথ কলেজে শিক্ষাজীবন সম্পন্ন করেন তিনি। ১৯৬০ সালে বিয়ে করেন তৎকালীন সেনা কর্মকর্তা জিয়াউর রহমানকে।
রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময়ে ফার্স্ট লেডি হিসেবে তিনি যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচারসহ বিভিন্ন বিশ্বনেতার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়ার শাহাদাতের পর ১৯৮২ সালের ২ জানুয়ারি তিনি বিএনপিতে যোগ দেন এবং অল্প সময়ের মধ্যেই দলের শীর্ষ নেতৃত্বে উঠে আসেন।
১৯৮০’র দশকে সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখ ছিলেন বেগম খালেদা জিয়া। সাতদলীয় জোটের নেতৃত্ব দিয়ে তিনি গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলন সংগঠিত করেন। এই সময় তাকে একাধিকবার গ্রেপ্তার ও কারাবরণ করতে হয়। তার আপসহীন নেতৃত্বের কারণে তিনি ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।
১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনে জয়ী হয়ে তিনি প্রধানমন্ত্রী হন এবং দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। তার শাসনামলে অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও নারী ক্ষমতায়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হয়। তৈরি পোশাকশিল্পে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় এবং লক্ষাধিক নারী শ্রমবাজারে যুক্ত হন।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তিনি গঙ্গার পানিবণ্টন ও রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকটসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেন। ২০০৫ সালে নারী ক্ষমতায়নে ভূমিকার জন্য ফোর্বস ম্যাগাজিন তাকে বিশ্বের প্রভাবশালী নারীদের তালিকায় স্থান দেয়।
বেগম খালেদা জিয়া রাজনৈতিক জীবনে কোনো সংসদীয় আসনে পরাজিত না হওয়ার বিরল রেকর্ডের অধিকারী। তিনি একাধিক আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে প্রত্যেকটিতেই জয়লাভ করেছিলেন।
তার ইন্তেকালে দেশ হারালো একজন আপসহীন গণতান্ত্রিক সংগ্রামী ও প্রভাবশালী রাষ্ট্রনায়ককে।
সত্য বলার সাহসই সত্যকণ্ঠ — নির্ভীক, নিরপেক্ষ, ন্যায়ের পথে।