
পিরোজপুর জেলা হাসপাতালে রোগীদের খাবার সরবরাহে অনিয়মের অভিযোগ
প্রতিবেদক: জাহিদুল ইসলাম, পিরোজপুর জেলা প্রতিনিধি
পিরোজপুরের ১০০ শয্যা বিশিষ্ট জেলা হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের জন্য সরবরাহ করা খাবারে নিম্নমানসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। রোগীদের অভিযোগ, তালিকা অনুযায়ী খাবার দেওয়া হয় না, যা দেওয়া হয় তা নির্ধারিত পরিমাণের তুলনায় কম এবং মানহীন। এছাড়া নির্ধারিত শয্যার চেয়ে রোগী বেশি থাকায় অনেক সময় খাবার না পাওয়ার অভিযোগও রয়েছে। ফলে একদিকে রোগীদের ভোগান্তি বাড়ছে, অন্যদিকে চিকিৎসা ব্যয়ও বেড়ে যাচ্ছে।
হাসপাতালে ভর্তি রোগীরা জানান, সকালের নাস্তার জন্য দুইটি পাউরুটি, একটি সিদ্ধ ডিম, সামান্য চিনি ও একটি কলা দেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তা ঠিকভাবে মানা হচ্ছে না। নিয়ম অনুযায়ী ৪ ইঞ্চি আকারের সবরি জাতের কলা দেওয়ার কথা থাকলেও দেওয়া হচ্ছে ছোট আকারের চিনিচাঁপা কলা। দুপুরের খাবারে মাছ দেওয়ার কথা থাকলেও প্রায়ই দেওয়া হচ্ছে বয়লার মুরগির মাংস। ৬০ গ্রামের বেশি মাংস দেওয়ার নিয়ম থাকলেও অনেক সময় ৫০ গ্রামেরও কম ওজনের মাংস দেওয়া হচ্ছে। বাজারে মাছের দাম বেশি হওয়ায় নিয়মিত মাছের পরিবর্তে মাংস দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
পেটে ব্যথা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগী আব্দুল জলিল বলেন, “সকালে যে রুটি দেওয়া হয় তা থেকে দুর্গন্ধ বের হয়, খাওয়া যায় না। ছোট একটা কলা আর ডিম দেয়। দুপুরে ভাতের সঙ্গে খুব ছোট এক টুকরো মুরগির মাংস দেওয়া হয়। খাবার খুবই নিম্নমানের ও পরিমাণে কম।”
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, অভ্যন্তরীণ বিভাগে ভর্তি রোগীদের ওষুধের পাশাপাশি প্রতিদিন সরকারিভাবে ১৭৫ টাকা মূল্যের তিন বেলা খাবার (সকালের নাশতা, দুপুর ও রাতের খাবার) দেওয়ার বিধান রয়েছে। বিশেষ দিবসে প্রতি রোগীর জন্য ২০০ টাকার খাবার বরাদ্দ থাকে।
দরপত্রের শর্ত অনুযায়ী, প্রতিদিন দুপুর ও রাতে ২৮ ইরি চালের ৩৩০ গ্রাম ভাত, সপ্তাহে পাঁচ দিন মাছ ও মাংস ৬৩.৬৬ গ্রাম করে দুই বেলা দেওয়ার কথা। সপ্তাহে দুই দিন মাছ ও ডিম এবং প্রতিদিন সকালে দুইটি পাউরুটি, একটি সিদ্ধ ডিম ও একটি পাকা সবরি কলা দেওয়ার নিয়ম থাকলেও বাস্তবে এর ব্যত্যয় ঘটছে। মাছ-মাংসের টুকরা ছোট, পাউরুটি ও কলা নিম্নমানের এবং তরকারিতে মসলার পরিমাণ কম থাকায় অনেক রোগী খাবার খেতে অনাগ্রহ প্রকাশ করছেন।
জানা গেছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দরপত্র মূল্যায়নে সর্বোচ্চ দরদাতা প্রতিষ্ঠান শেখ এন্ড সন্স ট্রেডার্স হাসপাতালের খাবার সরবরাহের দায়িত্ব পায়। তবে বেশি দরে দরপত্র বাগিয়ে নিয়েও রোগীদের নিম্নমানের খাবার দেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করছেন রোগীরা। আরও অভিযোগ রয়েছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের পর নতুন করে কোনো দরপত্র আহ্বান না করায় মেয়াদ শেষ হলেও একই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এখনো খাবার সরবরাহ করছে।
হাসপাতালের রাঁধুনি লাইলি আক্তার বলেন, “দুপুরে মাছ দেওয়ার কথা থাকলেও ঠিকাদার মাছের পরিবর্তে মাংস পাঠিয়েছেন, তাই মাংস রান্না করেছি। বাজারে সবরি কলা না পাওয়ায় চিনিচাঁপা কলা দেওয়া হয়েছে। আমরা ঠিকভাবে খাবার দিচ্ছি, তবে রোগীদের অভিযোগ থাকতেই পারে।”
এ বিষয়ে পিরোজপুরের সিভিল সার্জন ডা. মো. মতিউর রহমান বলেন, “হাসপাতালের সার্বিক কার্যক্রম মনিটরিংয়ের জন্য একটি কমিটি রয়েছে। অভিযোগের প্রেক্ষিতে আরএমও ও ঠিকাদারকে সঙ্গে নিয়ে পরিদর্শন করা হবে। আশা করি দ্রুত সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হবে।”
উল্লেখ্য, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে পিরোজপুর সমন্বিত জেলা কার্যালয় থেকে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পাঁচ সদস্যের একটি দল হাসপাতাল পরিদর্শন করে খাবারের পরিমাণ কম দেওয়ার সত্যতা পেয়ে সংশ্লিষ্টদের সতর্ক করেছিল। তবে সচেতন মহলের অভিযোগ, দুদকের সতর্কতার পরও কর্তৃপক্ষ কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
সত্য বলার সাহসই সত্যকণ্ঠ — নির্ভীক, নিরপেক্ষ, ন্যায়ের পথে।