
📰 রাজনীতির ট্রেন: লোকসানে ডুবে যাচ্ছে বাংলাদেশ রেলওয়ে
বিশেষ প্রতিবেদন
বর্তমানে বাংলাদেশের সবচেয়ে কম যাত্রী পরিবহনকারী আন্তনগর ট্রেনগুলোর একটি বিজয় এক্সপ্রেস। ২০১৪ সালে ময়মনসিংহ থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত চালু হওয়া এই ট্রেনটির গন্তব্য ২০২৩ সালের ১ ডিসেম্বর থেকে হঠাৎ করেই পরিবর্তন করে জামালপুর করা হয়। এতে যাত্রাপথ বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি কমতে শুরু করে যাত্রী সংখ্যা। বর্তমানে এই ট্রেন চালাতে যে আয় হয়, তা দিয়ে খরচই ওঠানো যাচ্ছে না।
রেলওয়ে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিজয় এক্সপ্রেসের রুট পরিবর্তনের আগে কোনো ধরনের সমীক্ষা করা হয়নি। মূলত ২০২৩ সালের জুলাইয়ে গণ-আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত হওয়া আওয়ামী লীগ সরকারের সময়, রাজনৈতিক নেতাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ফলে লাভ-লোকসানের বিষয়টি সম্পূর্ণ উপেক্ষিত ছিল।
শুধু বিজয় এক্সপ্রেসই নয়, গত এক যুগে মন্ত্রী-সাংসদদের আবদারেই একাধিক নতুন ট্রেন চালু, গন্তব্য পরিবর্তন এবং স্টেশনে ট্রেন থামানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা রেলওয়ের লোকসান বাড়িয়েছে বহুগুণে।
পূর্বতন রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজনের সময় দিনাজপুর ও আশপাশের জেলার প্রায় সব আন্তনগর ট্রেনের গন্তব্য বাড়িয়ে তার নিজ জেলা পঞ্চগড় পর্যন্ত নেওয়া হয়। এমনকি তাঁর ভাইয়ের নামে একটি স্টেশনের নামকরণ ও নতুন এক জোড়া ট্রেন চালুও করা হয়।
রেলওয়ে সূত্র জানায়, বর্তমানে অন্তত ৫টি আন্তনগর ট্রেনে যাত্রী ঘাটতি রয়েছে। অথচ এসব ট্রেন রাজনৈতিক চাপে চালু করা হয়েছিল। স্থানীয় মানুষ এসব ট্রেন বন্ধ চায় না, আবার যাত্রী সংখ্যাও আশানুরূপ নয়। ফলে রেলওয়ে এখন প্রতিবছর গড়ে আড়াই হাজার কোটি টাকা লোকসান গুনছে। অথচ ২০০৯-১০ অর্থবছরে এই লোকসান ছিল ৬৯০ কোটি টাকা।
২০১৮ সালে প্রায় ১,৭১৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ঈশ্বরদী-ঢালারচর রেলপথে সম্ভাব্যতা যাচাই না করেই ট্রেন চালু করা হয়। বর্তমানে সেখানে চলছে ঢালারচর এক্সপ্রেস, তবে কম দূরত্বে যাত্রী ওঠা-নামা করায় আয় খুবই কম।
ঢাকা-নোয়াখালী রুটের উপকূল এক্সপ্রেস এক সময় আসনের দ্বিগুণ যাত্রী বহন করত। কিন্তু ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত হওয়ায় এবং ভালো বাস সার্ভিস চালু হওয়ায় বর্তমানে ট্রেনটির যাত্রী সংখ্যা কমেছে আশঙ্কাজনক হারে।
এমন পরিস্থিতিতে ২০২৩ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় নতুন করে ‘সুবর্ণচর এক্সপ্রেস’ চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যদিও পর্যাপ্ত কোচ না থাকায় তা শুরু হয়নি। সরকার পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার সেই রুট বাদ দিয়ে কক্সবাজার রুটে ট্রেন চালু করে।
উত্তরাঞ্চলে এখনও যাত্রী চাহিদা বেশি। কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেস গড়ে ১১১ শতাংশ যাত্রী পরিবহন করে এবং মাসে আয় করে প্রায় ২ কোটি টাকা। একতা এক্সপ্রেস থেকে আসে গড়ে ৪ কোটি টাকার বেশি আয়। বরেন্দ্র এক্সপ্রেস ১২৪ শতাংশ যাত্রী বহন করে, যা সবচেয়ে বেশি।
তবে সমস্যা হচ্ছে—এই সব লাভজনক ট্রেনগুলোর নেই বিকল্প রেক (ট্রেন সেট)। ফলে দুর্ঘটনা বা বিলম্ব হলে সময়মতো ট্রেন ছাড়তে পারে না।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়ে ট্রেন রুট ও সেবার ‘রেশনালাইজেশন’ শুরু করেছে। এর আওতায় অলাভজনক ট্রেন বন্ধ এবং লাভজনক রুটে ট্রেন বাড়ানোর পরিকল্পনা আছে। অতিরিক্ত সচিব রূপম আনোয়ারের নেতৃত্বে গঠিত কমিটি এখন পর্যন্ত সুপারিশ তৈরি করতে পারেনি।
রেলপথ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেন, “রেলে কোচ সংকট রয়েছে, আবার কোনো ট্রেন একবার চালু হলে তা বন্ধ করতে গেলে স্থানীয়দের বাধার মুখে পড়তে হয়।”
বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক সামছুল হক বলেন,
“রেল যখন প্রকল্প নেয়, তখন লাভ দেখিয়ে নেয়। আবার মন্ত্রীরা প্রকাশ্যে বলেন, রেল লাভের জন্য নয়। এটাই অপেশাদারিত্ব। রেল এক টাকা আয় করতে আড়াই টাকা ব্যয় করে, এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।”
তিনি বলেন, “সমীক্ষা ছাড়া কোনো ট্রেন চালানো বা স্টেশন বাড়ানো উচিত নয়। এটা খুবই মৌলিক বিষয়।”
🔍 উপসংহার:
রাজনীতিকদের আবদার ও প্রতিশ্রুতি পূরণের দোহাই দিয়ে রেলকে অপচয়ের পথে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। লাভজনক সেবা উন্নয়ন না করে লোকসানী রুটে বিনিয়োগ করে রেলওয়ে আজ দায়ভার বহন করছে জনসাধারণের করের টাকায়। এখন সময় এসেছে রেল খাতে দক্ষতা ও পরিকল্পনার বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করার।
🟢 দৈনিক সত্যকণ্ঠ
“সত্য প্রকাশে আমরা সাহসী, আমরা সচেতন”