
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে অনেক শিক্ষার্থীই নিজে কিছু করে স্বাবলম্বী হওয়ার চেষ্টা করেন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে টিউশনি থাকে চাহিদার শীর্ষে। ইদানীং ফ্রিল্যান্সিং ও আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমেও শিক্ষার্থীরা নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন। আবার কেউ কেউ মনোযোগ দিচ্ছে বিভিন্ন অনলাইন ও অফলাইন ব্যবসায়। কিন্তু নতুন ও ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়ে কারও কারও স্বাবলম্বী হওয়ার গল্পও মাঝে মাঝে খবরের শিরোনাম হচ্ছে। তেমনই একটি নতুন ও ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়ে সফল হয়েছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র। প্রথমে নিজে উদ্যোগ নিলেও পরে সঙ্গী হন তার স্ত্রী। গড়ে তুলেছেন ‘বেঙ্গল’স সিগনেচার’ নামের অত্যাধুনিক সিল প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান। অত্যাধুনিক এই সিল বানিয়ে দেশজুড়ে সাড়া ফেলেছেন এই দম্পতি। তাদের দোকান রাজশাহীতে হলেও সারা দেশে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে তাদের তৈরি করা সিল পৌঁছে দিচ্ছেন তারা।
রাবির এই দুই শিক্ষার্থী হলেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের এস এম রিজন এবং হিসাববিজ্ঞান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের ২০২২-২৩. শিক্ষাবর্ষের নিশা আফরিন বর্ণা। পড়াশোনার পাশাপাশি ভিন্নধর্মী উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা হয় খবরের কাগজের সঙ্গে। নিজের গল্প শুনিয়ে রিজন জানান, তার অনেকগুলো বই আছে। যেগুলোর জন্য ষ্ট্যাম্প প্রয়োজন ছিল। নিজের বইয়ে ব্যবহৃত বুক ষ্ট্যাম্প দেখার একপর্যায়ে তিনি নতুন এই স্ট্যাম্পের কথা জানতে পারেন। তারপরই নতুন ডিজাইনের বুক স্ট্যাম্প বানানোর চিন্তা মাথায় আসে।
নিজের প্রয়োজনে সিল বানানোর চেষ্টা থেকেই বড় পরিসরে ব্যবসা শুরু করেন রিজন। ব্যবসার শুরুতে তাকে নানা চ্যালেঞ্জ ও বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। পরিবার থেকে ছিল কড়া নিষেধাজ্ঞা, চ্যালেঞ্জ ছিল অর্থ জোগানের। নানাভবে বুঝিয়ে বড় ভাইয়ের কাছে থেকে ১৮ হাজার ও নিজের জমানো ১২ হাজার টাকা দিয়েই শুরু করেন তিনি।
তখন এগুলো বানানোর জন্য কোনো পদ্ধতি বা যন্ত্রও তার কাছে ছিল না। বাংলাদেশে এসব স্ট্যাম্প বানানোর যন্ত্রাংশ পাওয়া যায় না বললেই চলে। তবে দেশের একটা ওয়েবসাইটেই এটা বিক্রি হয়। চায়নার একটা এজেন্সি থেকে প্রাথমিক অবস্থায় প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রগুলো নিয়ে আসেন তিনি। এরপর দেশীয় গ্রাফিক্স ডিজাইনার সেটার ওপর ডিজাইন করেন। এই ডিজাইনকে প্রিন্ট করার জন্য আলাদা প্রিন্টার দরকার হয়। প্রিন্ট শেষে বাকি প্রসেসের পর সেটা কুরিয়ারে যায়।
শুরুর দিকে এ সংক্রান্ত একটি ভিডিও বানিয়ে ফেসবুকে আপলোড করেন রাবির এই শিক্ষার্থী। ফেসবুকে আপলোড করা প্রথম ভিডিও থেকেই ব্যাপক সাড়া পান তিনি। ভিডিও দেখে প্রথম ৩০টি অর্ডার আসে। মজার ব্যাপার হলো তখন তাদের কাছে একটাও স্ট্যাম্প বানানো ছিল না। এখন চাহিদার তুলনায় লোকবল কম থাকায় বেশি অর্ডার নিতে পারছেন না তারা। তবে লোকবল বাড়লে হয়তো আরও বেশি অর্ডার নিতে পারবেন বলে জানান তারা। ক্রেতাদের কাছে সিলগুলো পৌঁছানোর পর গুণগত মান যাচাইয়ের জন্য প্রতিষ্ঠান থেকে তাদের ফোন দিয়ে রিভিউ নেওয়া হয়। তাদের কোনো পরামর্শ বা অভিযোগ থাকলে লিখে রাখা হয়। পরবর্তী সময়ে সেগুলো আবার মূল্যায়ন করা হয়। সব মিলিয়ে মাসে লক্ষাধিক টাকার মালামাল বিক্রি হয়। শুধু ডেলিভারি বয় বাদে এখানে যারা কাজ করেন তারা সবাই শিক্ষার্থী।
তাদের সঙ্গে আলাপের একপর্যায়ে দোকানে আসেন রিজনের বাবা ড. নিজাম উদ্দিন শেখ। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের উপ-রেজিস্ট্রার পদে কর্মরত আছেন। তিনি জানান, আমার ও পরিবারের কারও মত ছিল না রিজনের পক্ষে। আমরা ভেবেছিলাম এতে রিজনের লেখাপড়ার ক্ষতি হবে। তারপরও যখন আমাদের কথা না শুনেই ব্যবসা শুরু করে তখন আমরা সহযোগিতা করতে থাকি। এখন তারা দুজনেই পড়াশোনার পাশাপাশি ব্যবসা পরিচালনা করে যাচ্ছে ও সফলতার মুখ দেখতে পেয়েছে। ভবিষ্যতে আমিও তাদের সহযোগিতা করে যাব।