
🖋️ বিশেষ প্রতিবেদন | সত্যকণ্ঠ সংবাদ
একটি মানবাধিকার সংস্থার পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে বিএনপি ও এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে অন্তত ৪৩ জন নিহত হয়েছেন। এই ভয়াবহ পরিসংখ্যান নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—বিএনপি কি নিজ দলীয় কাঠামোর ওপর নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে?
সাম্প্রতিক আলোচিত ঘটনার একটি—পুরনো ঢাকার মিটফোর্ড এলাকায় যুবদলের সাবেক কর্মী লাল চাঁদ সোহাগকে প্রকাশ্যে হত্যা। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, পাথর দিয়ে থেঁতলে হত্যার নৃশংস চিত্র, যা সামাজিক মাধ্যমে তীব্র আলোড়ন তোলে।
পুলিশ জানায়, ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব এবং পূর্বশত্রুতার পাশাপাশি দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলও ছিল অন্যতম কারণ। হত্যাকাণ্ডে জড়িত হিসেবে বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের একাধিক নেতার নাম উঠে এসেছে। এদের মধ্যে রয়েছেন কেন্দ্রীয় যুবদলের সাবেক নেতা রজ্জব আলী পিন্টু, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক সাবাহ করিম লাকি এবং ছাত্রদলের অপু দাসসহ পাঁচজন।
আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)–এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত হয়েছেন ৬৫ জন, যার মধ্যে ৪৩ জনই বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে প্রাণ হারিয়েছেন। রাজনৈতিক সংঘাতের ২৭০টি ঘটনায় আহত হয়েছেন ২,৭৭০ জন।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, ৫ আগস্টের পর থেকে বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের তিন হাজার ২০০ জন নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
ছাত্রদল ও যুবদলও পৃথকভাবে শত শত বহিষ্কার ও নোটিশ দিয়েছে। কিন্তু বিশ্লেষকেরা বলছেন, “শুধু বহিষ্কারই যথেষ্ট নয়, বহিষ্কৃতরা যদি আবার ফিরতে পারেন বা দলে সক্রিয় থাকেন, তাহলে তা কার্যকারিতা হারায়।”
বিশ্লেষক ও মানবাধিকারকর্মী নূর খান বলেন, “বিএনপির অনেক নেতাকর্মী মনে করছেন, এবার তারা ক্ষমতায় আসবে—এই মনোভাব থেকেই তারা বেপরোয়া হয়ে উঠছে।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তৌহিদুল হক বলেন, “বিএনপি ইতিহাসে এবার সবচেয়ে বেশি সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিয়েছে, তবুও দলীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ।”
এক ভার্চ্যুয়াল বক্তব্যে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান অভিযোগ করেন, “পুরান ঢাকায় হত্যাকারীদের ফুটেজে দেখা গেলেও সরকার কেন তাদের গ্রেপ্তার করছে না? তাহলে কি সরকারের কোনো গোপন মদদ রয়েছে?”
একের পর এক সহিংস ঘটনা যেমন খুলনায় যুবদল নেতা মোল্লা মাহবুবের হত্যাকাণ্ড কিংবা পল্লবীতে চাঁদা না পেয়ে হামলা—এগুলোর বেশিরভাগেই বিএনপি নেতাকর্মীদের নাম উঠে আসছে।
মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএসএস বলছে, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত সময়ে ৪৬৮ জন সহিংসতায় নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে রাজনৈতিক সংঘাত, মব লিঞ্চিং, নারী নির্যাতন, সীমান্ত হত্যা প্রভৃতি রয়েছে।
পুলিশের এআইজি (মিডিয়া) ইনামুল হক সাগর বলেন, “অপরাধী যে-ই হোক, পুলিশ দ্রুত ব্যবস্থা নিচ্ছে। আমরা কোনো কার্পণ্য করছি না।” তবে তিনিও বলেন, “সমাজ ও পরিবারকেও দায়িত্ব নিতে হবে। শুধু পুলিশ যথেষ্ট নয়।”
সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া সত্ত্বেও, বিএনপির অভ্যন্তরীণ সহিংসতা কমছে না বরং তাদের দলীয় কাঠামোয় শৃঙ্খলার সংকট স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
বিশ্লেষকদের মতে, শুধু বহিষ্কার নয়—দলের মধ্যে সংস্কার, জবাবদিহিতা এবং প্রকৃত আইনি পদক্ষেপ ছাড়া পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব নয়।
📌 সত্যকণ্ঠ সংবাদ | অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় নিরপেক্ষ কণ্ঠস্বর
✍️ প্রতিবেদন: রাজনৈতিক বিশ্লেষণ বিভাগ